ত্রিপুরায় বাংলা কবিতা

স্বপন সেনগুপ্ত
.
জীবনের কাছ থেকে মর্মে মর্মে পাওয়া অভিজ্ঞতার খিলান, গম্বুজেই তো লুকিয়ে থাকে কবিতার স্থাপত্য। আর এই স্থাপত্য তো একজনের তৈরি নয়, বহুকালের বহুজনের মেধা, কল্পনা ও ঘামের উত্তরাধিকার।
ভাবতে গেলে অনেক কিছুই তো কেমন অ্যবাসার্ড। প্রতিটি সূর্যাস্তেই, যদিও পৃথিবীতে কখনও সূর্যাস্ত হয় না, প্রভাত, সায়াহ্ন ও রাত্রি হয়, তবুও আমাদের বয়স প্রতি রোববারে বেড়ে যায়। আলব্যের কাম্যুর ‘দ্য আউটসাইডার’ উপন্যাসের শুরুই একটি টেলিগ্রাম দিয়ে, ‘তোমার মা গত হয়েছেন। কাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। গভীর সহানুভূতি।’ আর আমাদের চোখের সামনেই তো ইতিহাস হয়ে গেল টেলিগ্রাম। আমরা এখন যে কোনও ঘটনার সংবাদ ও ছবি পেয়ে যাই মুহূর্তে। সময়ের চেয়ে সংবাদ এখন অনেক বেশি দ্রুতগামী। ত্রিপুরায় রচিত কবিতা তো কোনওকালেই বাংলা কবিতা থেকে আলাদা ছিল না।
বরং পেছন থেকে ছুটতে ছুটতে এগিয়ে যাওয়া সময়কে আমরা ধরতে চেয়েছি সেই ভগ্নহৃদয়(১৮৮১) এবং প্রেম মরীচিকার(১৮৯৬) কাল থেকেই। ভালোবাসার কাছে আমরা হেরে যেতে ভালোবাসি বলেই তো রাজ্যে রাজভাষা ছিল বাংলা। রাজকাহিনি লেখা হয়েছিল বাংলায়। রেভারেন্ড জেমস লঙ্ সাহেব যাকে বলেছেন oldest specimen of Bengali Composition, ধন্যমাণিক্যের সময় যার সূচনা। এরপরও আছে চম্পকবিজয়, কৃষ্ণমালা, আবার ব্যতিক্রমী গ্রন্থ ‘সমসের গাজীনামা’। রাজঅন্ত:পুরে রাজপুরুষেরা, রাজকুমারী অনঙ্গমোহিনী দেবী, কুমুদিনী, মৃণালিনী, কমলপ্রভা দেবীর বৈষ্ণব পদাবলি, কীর্তন এবং পরিশেষে যখন রবীন্দ্রানুকরণে ব্যস্ত তখনও বুনো হাতি নামতো শহরে। টিন বাজাতো আর মশাল জ্বেলে রাখতো রাতে, ভয়ে, মানুষেরা গণ্ডগ্রাম এই আগরতলায়। স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিলিতি পণ্য পোড়ানো, মন্বন্তর, এমনকী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনও প্রভাবই পড়েনি রাজআমলের ত্রিপুরায়। ইংরেজরা একটি বিমান ঘাঁটি বানিয়েছিল সিঙ্গারবিলে। কিন্তু জার্মনরা যদি ফোর্স না করতো কিংবা সুভাষ বসু যদি মণিপুর পর্যন্ত চলে না আসতেন, তবে কবে নাগাদ এই বিমানবন্দর হতো কে জানে।
রাজাদের ইংরেজি ভাষা বা ইংরেজ প্রীতি ছিল, - তা নয়। যুগান্তর, অনুশীলন সমিতির সশস্ত্র দেশপ্রেমিকরা মাঝেমধ্যে আত্মগোপন করতো রাজাদের জ্ঞাতসারেই এই ত্রিপুরায়। ছোটোখাটো পাহাড়ি যুদ্ধ, রাজধানী স্থানান্তর, বিতর্কিত রতনমণির বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহ ছাড়া সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ছিল মন্থর, গতিহীন এবং রাস, হোলি, ঝুলনের উৎসবে মাতোয়ারা। বৃহত্তর ভারতের জাতীয় জীবনের উত্থান পতন ক্ষোভ বিদ্রোহের কোনওরকম তরঙ্গাঘাত আছড়ে পড়েনি স্বাধীন ত্রিপুরায়। রাজ আমলে প্রথম মুদ্রাযন্ত্র স্থাপিত হলেও এর কোনও প্রভাব পড়েনি জনজীবনে। কবি সুধীন্দ্রনাধ দত্ত বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথই আমাদের সাহিত্যের সিদ্ধিদাতা গণেশ। সাতবার তিনি এই ছোটো রাজ্যে এসেছিলেন, তাঁর সাহিত্যে বৌদ্ধ ধর্মের মতোই জায়গা করে নিয়েছে ত্রিপুরার রাজাদের মহানুভব রাজধর্ম। ত্রিপুরা সাহিত্য সন্মিলনী সভা(১৯০৫), কিশোর সাহিত্য সমাজ গঠন এবং ‘রবি’ পত্রিকা প্রকাশ তো আমাদের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। এইসবের সময়সীমা ছিল ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত।
প্রথমে দেশভাগ, পরে স্বাধীনতা এবং ১৫ অক্টোবর, ১৯৪৯ অঙ্গরাজ্য হিসাবে ভারতের সঙ্গে ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্তি, রাজতন্ত্রের অবসান, গণতন্ত্রের উত্থান, বিপুল উদ্বাস্তু স্রোত, জনবিন্যাসের চরিত্র বদলে যাওয়া,-এতগুলো ছন্দপতনের পর আর স্থির রইলো না ত্রিপুরার জনজীবন। ত্রিপুরার রাজাদের বিশাল জমিদারি এবং প্রধান আয়ের উৎস চাকলা-রোশনাবাদ কিন্তু থেকে গেল ওপারেই। কাতারে কাতারে সেদিন যারা এসেছিলেন, সম্ভবত মহারাজার সেই প্রজাদের বেশির ভাগই ছিলেন কৃষিজীবী। বাংলা সাহিত্য নিয়ে তাঁদের তেমন আগ্রহ না থাকলেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন গ্রাম বাংলাকে। মুখে মুখে নিয়ে এসেছিলেন ভাটিয়ালি গান, কীর্তন, নৌকাবিলাস, নিমাইসন্ন্যাস, কথকতা, দেহতত্ত্বের গান, লোকগীতি আর লাল শালুতে মোড়া মনসার পুঁথি। এখানে নাব্য নদী না থাকলেও, গোরুর গাড়িতে মশাল জ্বেলে একটু রাতের দিকে ভাটিয়ালি গান গেয়ে বাড়ি ফিরতো গাড়োয়ান। পরে ধীরে ধীরে এই রাজ্যে গড়ে ওঠে মিশ্র সংস্কৃতি এবং এক মিশ্র অদ্ভুত বাংলা ভাষা। আর্থ-সামাজিকভাবে থিতু হতে হতেই একটা প্রজন্ম বুড়িয়ে যায়। অজিতবন্ধু দেববর্মা, দুর্গাদাস ভট্টাচার্য, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য, নুরুল হুদারা যখন সাহিত্যচর্চা করতেন তখনও এই শহরে মোরামের রাস্তা হারিয়ে যায়নি, পাহাড়ে বড় বড় গাছ নামাতে, দুর্গম এলাকায় যেতে ভরসা ছিল হাতি। তখন থেকেই শুরু হয় নতুন করে পলি খোঁজা। হাতের কাছে কাগজ ছিল ‘নবজাগরণ’। অধ্যাপক ও বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, যাঁর কথা সুন্দর জার্নাল-এ রয়েছে, তাঁর পৌরোহিত্যে ১৯৫৩ সালে গড়ে ওঠে ‘সাহিত্য বাসর’। কিশোর সাহিত্য সমাজের সঙ্গে সাহিত্য বাসরের দূরত্ব প্রায় তিন দশকের। মন ও মেজাজের দূরত্ব আরও অনেক।
ত্রিপুরায় আধুনিকতার গতি সঞ্চারে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, পূর্ণেন্দুবিকাশ ভট্টাচার্য, অশোক সিংহ, রণেন্দ্রনাথ দেব, মোহিত পুরকায়স্থ, কার্তিক লাহিড়ি, বিজনকৃষ্ণ চৌধুরিদের অবদান ছিল অসামান্য। তাঁদের সান্নিধ্যে এবং নিজেদের তাগিদেই গড়ে উঠেছিল ইয়ং ত্রিপুরা। অসংগঠিত এই সংগঠনের সদস্য ছিলেন ভূপেন দত্ত ভৌমিক, ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য, অনিল সরকার, মানস দেববর্মন, কল্যাণব্রত চক্রবর্তী, খগেশ দেববর্মন, কালিপদ চক্রবর্তী, কিরণশংকর রায়, ধীরেন বসাক, অশোক দাশগুপ্ত, বিমান ধর, চিদানন্দ গোস্বামী, অজয় রায়, বিচিত্র চৌধুরী, প্রদীচ চৌধুরী, প্রবীর দাস প্রমুখ। সে সময় মহারাজা বীরবিক্রম কলেজের মুখপত্র ‘প্রাচী’ ছিল আমাদের কাছে ‘সবুজপত্র’। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় ত্রিপুরা থেকে খগেশ দেববর্মন এবং সলিলকৃষ্ণ দেববর্মন সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতার প্রথম সংকলন ‘প্রান্তিক’। এর দু’দশকেরও বেশি সময় আগে প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’। আর ‘প্রান্তিক’-এর দু’দশক পরে ১৯৮২ সালে বর্ণমালা থেকে প্রকাশিত প্রথম গল্প সংকলন ‘নশ্বর নক্ষত্র’ ছিল ‘নান্দীমুখ’ বিশেষ গল্প সংকলনের অফপ্রিন্ট। শুধু দু’টো পুরোনো গল্প যোগ করে নেওয়া হয়েছিল। ত্রিপুরা থেকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস সম্ভবত বীরেন দত্তের ‘গ্রামের মেয়ে’(১৯৭৮)। প্রান্তিকের প্রায় একদশক পরে বের হয়েছিল ‘দ্বাদশ অশ্বারোহী’(১৯৭৩)। পরবর্তী সময়ে এই সংকলনেরই দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। নান্দীমুখের বছর দুয়েক আগে প্রকাশিত কবিতাপত্র ‘জোনাকি’।
রাজ মাহাত্ম্যমূলক কাহিনি থেকে সরে এসে গীতিকবিতার সূচনা হয়েছিল বীরচন্দ্র মাণিক্য হয়ে অনঙ্গমোহিনীর কাব্যচর্চায়, তাঁর তিনটি কাব্যগ্রন্থে। ত্রিপুরার প্রথম স্বীকৃত কবি অনঙ্গমোহিনী দেবীর সার্ধ জন্মশতবর্ষ চলছে। তিনিও সে সময় মাইকেল, হেমচন্দ্র ছুঁয়ে ছুটেছিলেন রবীন্দ্র-কবিতায়, পতঙ্গ যেমতি ধায়। রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ত্রিপুরায় আসার ৬ বছর পর প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ শোককাব্য ‘শোকগাথা’। ওই পরিবারেরই কবি সলিলকৃষ্ণ দেববর্মনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জলের ভেতর বুকের ভেতর’ প্রকাশিত হয়েছিল শোকগাথার প্রায় ৭০ বছর পর ১৯৭৩ সালে। সত্তর বছরের ব্যবধানে দু’জনের কবিতা-ভাষা বদলে গেছে অনেকখানি। শোকগাথার ‘চিরস্মৃতি’ কবিতার অংশ-
দিবস রজনী হৃদে জাগে নিতিনিতি
কেবলই বিষাদময় সেই শেষস্মৃতি।
জন্মশোধ বিদায়ের বিষাদ-চুম্বন,
যাতনায় ক্লিষ্ট এই বিবর্ণ বদন।
আকুল বিষাদভরে হাতে হাত রাখি।
চেয়েছিল অশ্রুপূর্ণ প্রভাহীন আঁখি।
সলিলকৃষ্ণ দেববর্মনের প্রথম গ্রন্থের নাম-কবিতায় বদলে গেল অনেক কিছুই-
জলের ভেতর ডুবিয়ে দিলাম ফুলগুলি
উঠলো না আর কোথাও ভেসে ভালোবাসার মুকুটমণি
চারিধারেই পাথর আমার স্থবির স্থির
মায়াকান্না শোনেন না আজ দেওয়ালগুলি
যেমন তারা সদাই ছিল উচাটন;
সত্তর থেকে বিশের দশক অব্দি ত্রিপুরায় ঘটে যায় আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বহু জটিল বাঁক ও বিবর্তন। কিন্তু তার অভিঘাত তেমনভাবে দেখা যায়নি কাব্য সাহিত্যে, বরং প্রাধান্য ছিল লিরিকধর্মী গীতিকবিতারই। যদিও ধীরে ধীরে কবিতায় এসেছিল ভাবগত এবং ঐশ্বর্যগত পরিবর্তন। প্রান্তিক-উত্তরকালে কবিরা পৌঁছে গেলেন বাংলা কবিতার সমসাময়িক ভুবনে। সুপরিচিত হয়ে উঠলেন অনেকেই বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে। তাঁদের মধ্যে শঙ্খপল্লব আদিত্য, প্রদীপ চৌধুরী, রণেন্দ্রনাথ দেব, কল্যাণব্রত চক্রবর্তী, স্বপন সেনগুপ্ত, পীযুষ রাউত, তপন দাশগুপ্ত, প্রদীপবিকাশ রায়, রাতুল দেববর্মন, নকুল রায়, অসীম দত্তরায়, দিলীপ দাস, সমরজিৎ সিনহা, পল্লব ভট্টাচার্য, প্রবুদ্ধসুন্দর কর, মিলনকান্তি দত্ত, রামেশ্বর ভট্টাচার্য, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, কিশোর রঞ্জন দে, স্বাতী ইন্দু, লক্ষণ বনিক, শুভেশ চৌধুরী, সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, সেলিম মুস্তাফা, দিব্যেন্দু নাগ, জাফর সাদেক, অশোক দেব, শঙ্খ সেনগুপ্ত, অনন্ত সিংহ, আকবর আহমেদ, প্রদীপ মজুমদার, পঙ্কজ বনিক প্রমুখ অনেকের কথাই আলাদাভাবে উল্লেখ্যের দাবি রাখে এবং ইতিমধ্যে অনেকেরই একাধিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত। ত্রিপুরা থেকে এই সময়ে প্রকাশিত বাংলা কবিতা সংকলনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গঙ্গাগোমতী(১৯৯১), উড়ে যায় স্বর্ণমেঘ(১৯৮৫), ত্রিপুরার বাংলা কবিতা(১৯৯৬), ত্রিপুরার কবিদের স্বনির্বাচিত কবিতা সংকলন(১৯৭৩) এবং পুবের হাওয়া(১৯৭৪)। বাংলা ছড়ায় সৃষ্টিশীল ছড়াকার অনিল সরকার, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, অপরাজিতা রায় এবং চুনি দাশ।
এখন চারপাশে স্রোত আর প্রতিস্রোতের নিত্য মন্থন। কোনও কবিতা মুহূর্তমঞ্জরী, কোনওটি কালের যাত্রার সাথে ধ্বনি মিশিয়ে দেয়; যাত্রা তার বিষয় থেকে বিষায়ান্তরে, প্রচলিত ছন্দ থেকে গদ্যভাষায়। সংকেত এবং বহুমুখী অর্থশক্তি নিয়ে প্রতিটি নতুন কবিতাই পৌঁছে যায় এক নতুন আবিষ্কারে। সবাই ঘুমিয়ে গেলেও কবি কিন্তু জেগে থাকেন অনন্তকাল। প্রতিযোগিতা থেকে দূরে, নিজেকে খুঁড়ছেন, সময়কে খুঁড়ছেন কবি, আর অস্তিত্বের নিহিত পাতাল ছায়া থেকে তুলে আনছেন একেকটি মুহূর্তমঞ্জরী। যদিও হাওয়া খুব দ্রুত বদলে চলেছে নি:শব্দের তর্জনি সংকেতে। বাংলা কবিতার মূল স্রোতে সহবস্থান করলেও ত্রিপুরায় একমাত্র বিক্ষিপ্তভাবে কবিতায় ও গদ্যে হাংরি আন্দোলনের অভিঘাত ছাড়া আর কোনও আন্দোলন দাগ কাটেনি গভীরে। ১৯৬৫ সালে শ্রুতি ও ঈগলের শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬১ সালে ধ্বংসকালীন কবিতা আন্দোলন, ১৯৮২ সালে থার্ড লিটেরেচর কিংবা ১৯৮৫ সালের উত্তর আধুনিকতার পরও প্রশ্ন জাগে আমাদের কবিতা কি কখনও অমোঘ হয়ে ওঠেছে প্রেমে, আত্ম-উন্মোচনে, সময়ের স্বৈরাচারে, কুটিল রাজনীতির মদমত্ততার প্রতিবাদে। প্রশ্ন জাগে, আত্মপ্রচার ও বিজ্ঞাপনের আপ্লুত সময়ে আমরা কোন দিগন্তে হাঁটছি সম্মিলিত উচ্চারণে ? কবিকে ভাষার মধ্যেই ভাষা খুঁজতে হয়, সময় সমাজ ও মানুষকে। আবেগে মননে মেধায় খনন করতে হয় রোজদিন। আস্ত একটি উপন্যাসকে কবিরাই প্রকাশ করতে পারেন মাত্র একটি অথই পঙক্তির আশ্চর্য সংযমে। কবিরাই ছড়িয়ে দেন বীজবিন্দু, গুহা থেকে নিষ্ক্রান্ত হয় বৃষ্টি। আধুনিক জীবনের সমবয়সি বিষাদ, দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ, প্রতিবাদ, নিয়ত প্রতিধ্বনিত আমাদের বাংলা কবিতায়। পূর্বোত্তরের কবিতাকে বাদ দিয়ে তো বিশ্ব বাংলা কবিতার বৃত্তই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেজন্য পূর্বোত্তরের বাংলা সাহিত্য নিয়ে আলাদা কোনও মিথ তৈরি নিরর্থক। সমবেতভাবে আমরা সবাই তো এই সময়ের সহচর এবং সমুদ্রগামী। ভুবন তো বৃহদর্থে সূর্যশাসিত একটাই। ১৯৭১ সালে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ঘরের কাছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম। সময়ের ধর্মে আজ যা বর্তমান কাল তা হয়ে যাবে অতীত। জলের ভেতর বুকের ভেতর-এর(১৯৭৩) কবি গোত্রান্তরে চলে যান ‘মধ্যরাতে স্বাধীনতা’(১৯৮৭) কাব্যে। প্রদীপ চৌধুরি হাংরি জেনারেশনের হয়েও হাংরি নন। বরং অনেক বেশি মানবিক ও রোম্যান্টিক আবেদনে তাঁর ’৬৪ ভূতের খেয়া’ কাব্যের কবিতা বহুমাত্রিক এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে বিদ্যুৎময়।
আরেকটি অতিরিক্ত সিঁড়ি আমার আত্মার মধ্যে তৈরি হচ্ছে,
ঘন জঙ্গলের নীচে তার ছায়া
অনবরত কাঁপছে, আমার ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দের
দাগ লেগে আছে ওর শরীরে
ও আমার গলে যাওয়া শরীর
(ও আমার গলে যাওয়া শরীর)
‘অন্ধকারে প্রণামের ইচ্ছে হয়’ থেকে ‘যেখানে থামতে হবে’ পর্যন্ত পাঁচটি কাব্যগ্রন্থে কল্যাণব্রত চক্রবর্তী নিজের বিবর্তনকে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিয়ে যেতে পারেননি হেমন্তের আলোয়। এখনও গ্রাম বাংলার স্মৃতিকল্প, ব্যক্তিগত অনুভব, আত্মমগ্ন সংলাপ, বিমূঢ় সভ্যতা-বিলাপ, কখনও গীতিধর্মী কখনও আটপৌরে ভাষায় উচ্চকিত – নতুন এক নিজস্ব ব্যাসার্ধ সৃষ্টির ক্রমিক প্রত্যাশায়। নিজেকে ভাঙছেন, কিন্তু দু’মেটে, তিন মেটের কাজ যেন শেষ হচ্ছে না।
মাথায় মশারি সেই লখিন্দর ঘুমিয়ে পড়েছে-
আশঙ্কা জড়িত কবি দেখে শুনে নানা কথা ভাবে,
কে জাগাবে অসময়ে, যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে
বিকেলের আগে ক্লান্ত ঘোড়া ফিড়ে আসে
শহরের নিরন্ধ্র গলিতে।
(ভূকম্পন)
শঙ্খপল্লব আদিত্য প্রথম থেকেই যেন আমি একা হতেছি আলাদা। কবিতার আঙ্গিক, শব্দ ব্যবহার, ক্ষোভ, শ্লেষ, মেজাজ, ছন্দ কাতরতাহীন বিষাদ ব্যঞ্জনায় নীলকন্ঠ। একেবারে জাত রোম্যান্টিক। বাংলাদেশের স্মৃতি, অনুষঙ্গ, উপমার পর উপমা, চিত্রকল্পের পর চিত্রকল্পে যেন একদিকে ভাঙছেন, অপরদিকে গড়ছেন, কখনও গর্জনে কখনও স্বগত সংলাপে।
জীবনের চেয়ে বড়ো কিংবা ছোট নয় চারদিক সমান
ন্যাংটো বা পোশাকি কোনও জীবন নয়, বসন্ত কোয়ার্টার গার্ডে তুমি পঞ্চাশ
পঞ্চাশ আমিও পঞ্চাশ পঞ্চাশ
এক একটি আলুনি বছর কেটে যায়
তুমি শুধু দিয়ে যাও, আমি হাত পেতে তুলে নেবো জিভের
লালায়
ঠিক সময় মতো তুমি একা
যখন যেখানে আমাকে ন্যাংটো করতে পেরে সুখ কামাল করো।
(সময় কুকুর)
কবি পীযূষ রাউত ‘বিষণ্ন উদ্যানে বৈশাখ’ থেকে ‘জন্মজুয়াড়ি’, ‘চিনি কম’ পর্যন্ত পরিক্রমায় সহজেই উপমায় চিত্রকল্পে মেট্রোপলিটান সভ্যতাকে বিদ্ধ করতে করতে কাছাড় শিলচরের অনুষঙ্গে কিংবা ত্রিপুরার পটভূমিকায় নিজের সঙ্গে আত্মগত সংলাপে আমাদের পৌঁছে দেন এক বিষাদ স্তম্ভে কিংবা অস্থির সময়ের প্রান্তরে। প্রতীকী মোড়কে যেন শুনিয়ে যান মানুষেরই স্বগত কথা ও কাহিনি।
ক্যাপসুলের মত গিলে খাও। বিরক্তি খাও ভালবাসা খাও
টানা তিনমাস খাও। তাহলেই
চিচিংফাঁক কারেন্সি নোটের নতুন গন্ধে ফিরে পাবে
তাগড়া যৌবন
(খাও)
নকুল রায়ের বইগুলোর নামই চিনিয়ে দেয় কবির স্বকীয় কন্ঠস্বর। ডায়নামিক ফরম এবং প্রতিবাদী কন্ঠস্বর সত্ত্বেও কবি যেন সূত্রধারের ভূমিকার বাইরে যেতে অনাগ্রহী। কবিতার গ্রন্থগুলোতে তাঁর ক্রমবিবর্তনে মনে হয় যেন ধুম লেগেছে হৃৎকমলে।
শব্দের কোলাহল
পেরিয়ে বেহালায় বেশি দূর নিয়ে যেতে পারে না ছড়,
নিমজ্জিত
পেরেক আমাদের অবহেলিত ধাতু রোগ নিয়ে প্রতিদিন
বসতি সদন ধসে পড়ে।
(শব্দশৈল এবং শানিত দীপমল্লিকা)
কবি দিলীপ দাস মনে করেন, ‘সময়ের সঠিক লক্ষণ যে কবিতায়, যে সাহিত্য-শিল্পকর্মে, যত বেশি প্রকট, ভবিষ্যৎ সময় দেখেছি তাকে ততো বেশি মনে রাখে।’ ম্যাক্সিম গোর্কির ভাষায় লেখক হলেন, তাঁর দেশের ও তাঁর শ্রেণির মুখপাত্র, ‘মানবাত্মার ইঞ্জিনীয়ার’। দিলীপের ‘চড়কা’ কবিতা-
চড়কা কেটে গিনেসে নাম তোলা যায় না।
চড়কা এখন পুরোনো প্রতীক। কেউ বলেন,
সামন্ততান্ত্রিক চিহ্ন। তবু যে
চড়কা নিয়ে এত হট্টগোল
সে তো গান্ধিজি নিজের চড়কায় তেল দিতেন বলে।
রাজনৈতিক ভাবনা এবং অভিজ্ঞতাকেই অনিল সরকার প্রকাশ করেছেন তাঁর ‘ব্রাত্যজনের কবিতা’ এবং ‘প্রিজনভ্যান’-এ। ব্যক্তিগত মেধা ও অধীত শ্রমে কেউ কেউ খুলে দিচ্ছেন অমৃতকুম্ভের মুখ। যেমন পল্লব ভট্টাচার্যের কবিতায়-
বসে আছো, চারদিকে বাড়ির উল্লেখ স্পষ্ট, সীমাবদ্ধ
মাঝখানে মাথা নীচু, ভূমিকাবিহীন দুটি হাত
নিস্তেজ, অনুনয়ে একা। বাড়ির বাহুল্য তুমি
ফুটপাথ, ভাঙা ফুলদানি।
(জীবকলা)
কিংবা প্রবুদ্ধসুন্দরের ‘জন্মলিপি’-
অন্ধকারের গতিবেগ ছিল মৃত্যুযাত্রা
ফিরে এসে দেখি সমূহ অপূর্ব রূপ
জীর্ণবাসের ভস্ম দিয়ে ঘোর শূন্যে লিখে রাখি
দিবানিশি ইহ জন্মলিপি।
কিন্তু সংকট আমাদের গভীরে, কুটিল ইশারা, ট্রাজিক কৌতুকে বিপন্ন আমাদের সময়। ইউনেস্কোর পরিসংখ্যানে বিশ্বে বাংলা পঞ্চম ভাষা, পঁচিশ কোটি লোকের মাতৃভাষা। কিন্তু ইউনেস্কো হয়তো জানে না এই বিশাল সংখ্যার কতো সংখ্যক লোক এই হাইব্রিড পলি-প্রিয়েস্টের যুগেও বাংলা পড়তে লিখতে বলতে জানে না, বাংলা তাদের মাতৃভাষা সত্ত্বেও। এই ভয়ংকর সংকটে কোথায় আমরা খুঁজে পাব ঈশ্বরকণা। আরও একশো বছর পরে কি বাঙালিরা বাংলা কবিতা পড়বে, না বাংলা কবিতার ইংরেজি অনুবাদ পড়বে ? কারণ, তখন মাতৃভাষা প্রায় ভুলে যাওয়া পাঠকরাই তো থাকবেন মেধাবী মেজরিটি। মনে হয়, ভয়ের সমুদ্রে শুধু বিদ্রোহের প্রভাত মাইকেল। আমাদের রাজ্যে বাংলা কবিতার তো আরও সংকট। সার্কিটে নতুন কবি কোথায়? যারা এই যান্ত্রিক ধাবমান সময়ের শরীরে ইনজেক্ট করবে লোকভুবনের রক্ত। বেশির ভাগ বাঙালি কবিই তো মাছ-ভাতের বিপ্লবী ছা-পোষা মধ্যবিত্ত। কবিতার পাঠক সংখ্যাও রোজদিন কমছে, এই অসময়ে কবিতার শরীর থেকে যাবতীয় গয়না, যূথি বেলি খুলে ফেললে কী হয় ? গিটার বাজানোর মতোই কবিতা পড়তে হবে হাসতে হাসতে। কবিতা চর্চার মতো এত কম খরচে বড় হৃদয়ের শিল্পচর্চা আর কোথায় পাওয়া যাবে ? বাংলা ভাষাকে বাঁচানো, কবিতাকে আরও বেশি মুখের ভাষার কাছাকাছি নিয়ে আসার দায় তো বাঙালি কবিদেরই। কবিরাই তো সংবাদের আগে চলেন, সময়ের আগে। সময়ের ভাষা তাঁরাই সৃষ্টি করেন। ধারাবাহিকতার অভাব কাটিয়ে আরও বেশি সমসাময়িক এবং ওয়েল ইক্যুইপড্ থাকতে হবে আমাদের। ভাষা রোজদিন পাল্টে যাচ্ছে, অনুষঙ্গ ভাঙছে। এই সময়ে সংগীত ও চিত্রকলা, লোকসাহিত্যে ফিরে তাকানো ছাড়াও দেশি-বিদেশি সমসাময়িক কবিতা ভুবনের প্রতি আমাদের হয়ে উঠতে হবে মনোযোগী পাঠক। আমরা জানি, ভাষার মৃত্যু হয়, জন্ম হয় না। হয়তো সেরকম দুর্দিন বাংলাভাষার না-ও হতে পারে, কারণ ইন্ডিয়া থেকে বাংলা ভাষা হারিয়ে গেলেও, বাংলাদেশ থেকে হারাবে না। কবি সুবোধ সরকারের আপ্তবাক্যের আমিও শরিক। কবির শব্দ যেখানে থামে আলোর তো সেখানেই শুরু।
.
লেখক পরিচিতি
(কবি স্বপন সেনগুপ্ত, জন্ম : ২ ডিসেম্বর, ১৯৪৫ ইংরেজি।
শিক্ষা : সাহিত্য নিয়ে পড়ালেখা। সাহিত্য বিষয়েই পিএইচডি।
পেশা : সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পর দৈনিক সংবাদ পত্রের সঙ্গে যুক্ত। বৈশাখ ১৩৭৩ থেকে ‘নান্দীমুখ’ সম্পাদনা। তথ্য সংস্কৃতি দফতরের পাক্ষিক মুখপত্র ‘গোমতী’ সম্পাদনা। ত্রিপুরা বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন ‘ত্রিপুরা প্রসঙ্গ’ সম্পাদনা (১৯৭৫)।
সম্পাদিত কবিতা সংকলন : দ্বাদশ অশ্বারোহী (১৯৭৩), গঙ্গা-গোমতী (১৯৮৩), উত্তরপূর্বাঞ্চলের বাংলা কবিতা (২০০৪), কবি অনঙ্গমোহিনী দেবীর কবিতা ও কাব্যালোচনা (২০১১)।
গদ্যগ্রন্থ : পঞ্চাশের মন্বন্তর ও বাংলাকবিতা (গবেষণাগ্রন্থ – ২০০৪), স্বনির্বাচিত লেখালেখি (২০০৬), ত্রিপুরার গল্প কবিতা ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১৫)।
নাটক : কবন্ধ (১৯৮২)।
কাব্যগ্রন্থ : নীল আকাশ পাখি (১৯৬৬), এ আমার ভিখিরি হাত নয় (১৯৮১), লাল ঘাসে নীল ঘোড়া (১৯৮৫), ধুলো মাখা পিঁড়িতে একাকী (২০০১), দহন ও জলস্তর (২০১০), কবিতাসমগ্র-১ (২০১২), হারানো ঢেউয়ের জলপাই শিস (২০১৪)। বিশ্ব বাংলা কবিতা সংকলন (উত্তম দাস সম্পাদিত), পেঙ্গুইন বুকসের Dancing Earth (পূর্বোত্তরের কবিতা সংকলন, ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত সমস্ত কবিতা সংকলনেই কবিতা সংকলিত।
পুরস্কারওসম্বর্ধনা : সারা বাংলা কবি সম্মেলন (১৯৭৩) থেকে সম্বর্ধনা, ত্রিপুরা সরকারের কবি সুকান্ত স্মৃতি পুরস্কার (২০০৬), রবীন্দ্র পরিষদ থেকে বিজনকৃষ্ণ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার (২০০৭), ত্রিপুরা সরকারের কবি সলিলকৃষ্ণ দেববর্মন স্মৃতি পুরস্কার (২০১১), মুম্বাই রমানাথ ভট্টাচার্য স্মৃতি ফাউন্ডেশন রামনাথ বিশ্বাস স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার (২০১৩), নন্দিনী স্মৃতি সাহিত্য সম্মান (২০১৫)।)

মন্তব্যসমূহ